ইউরোপে পণ্য পাঠানোর কথা বলছেন, আর বায়ার হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসল, “CE Marking আছে তো?” এই একটি লাইন শুনেই অনেকে একটু ঘাবড়ে যান। আসলে ঘাবড়ানোর কিছু নেই, শুধু ব্যাপারটা আপনাকে কেউ ঠিকমতো বুঝিয়ে দেয়নি। নেটে সার্চ দিলেও যা পাওয়া যায়, তার বেশিরভাগই একই কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলে, সংজ্ঞা দেয়, কিন্তু আসল কাজটা কীভাবে করবেন সেটা বলে না।
আমরা প্রতিদিনই বিভিন্ন প্রস্তুতকারক আর রপ্তানিকারকদের সাথে কথা বলি, আর দেখা যায় এই প্রশ্নগুলোই ঘুরেফিরে আসে। কোন পণ্যে CE লাগবে, খরচ কেমন পড়বে, কতদিন লাগবে, আর নিজেই করা যায় কিনা। আজকে সেই প্রশ্নগুলোর একদম সোজাসাপ্টা উত্তর দিচ্ছি।
সোজা বাংলায় বললে, CE Marking হলো একটা চিহ্ন বা প্রতীক, যেটা পণ্যের গায়ে লাগানো হয়, যাতে বোঝা যায় এই পণ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা আর পরিবেশগত নিয়মকানুন মেনে বানানো হয়েছে। CE শব্দটা এসেছে ফরাসি Conformité Européenne থেকে, মানে ইউরোপীয় সামঞ্জস্য।
একটা ভুল ধারণা এখানে হরহামেশাই দেখা যায়। অনেকে ভাবেন CE Marking মানে বুঝি পণ্যটা ইউরোপেই বানানো, বা কোনো ইউরোপীয় সংস্থা এসে পরীক্ষা করেছে। আসলে এমন কিছু না। এটা মূলত প্রস্তুতকারকের নিজের ঘোষণা যে তার পণ্য EU এর নিয়ম মেনে চলে। ইউরোপীয় কমিশনের নিজের ওয়েবসাইটেও পরিষ্কার লেখা আছে, CE Marking কোনো কোয়ালিটি সার্টিফিকেট না, এটা শুধু নিয়ম মানার প্রমাণ।
চারটা কারণে বাংলাদেশি প্রস্তুতকারকদের জন্য এটা জরুরি হয়ে দাঁড়ায়।
এক নম্বর, আইনি ব্যাপার। যেসব পণ্য নির্দিষ্ট EU নিয়মের আওতায় পড়ে, সেগুলো CE ছাড়া ইউরোপের বাজারে ঢুকতেই পারবে না। কাস্টমসে আটকে যাওয়া থেকে শুরু করে জরিমানা পর্যন্ত হতে পারে।
দুই নম্বর, বায়ারের বিশ্বাস। বড় ইউরোপীয় ইমপোর্টাররা সাধারণত CE ছাড়া অর্ডার কনফার্মই করে না, কারণ তাদের নিজেদেরও দায় থাকে।
তিন নম্বর, কাজ তাড়াতাড়ি হয়। CE Marking থাকলে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স মোটামুটি ঝামেলা ছাড়াই হয়ে যায়।
চার নম্বর, ঝুঁকি কমে। পরীক্ষিত আর কাগজপত্র ঠিক থাকা পণ্য মানে পরে কোনো সমস্যা হলে আপনার হাতে প্রমাণ থাকবে।
এই প্রশ্নটা প্রায় সবাই করেন, তাই আলাদা করে বলে নিই। CE Marking কোনো তৃতীয় পক্ষ দেয় না, এটা মূলত একটা স্ব ঘোষণা। কিছু বেশি ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের বেলায় অবশ্য একটা নোটিফায়েড বডির মূল্যায়ন লাগেই, তখন একা একা কিছু করার উপায় নেই।
সহজ করে বললে, প্রস্তুতকারক নিজে দাঁড়িয়ে বলছেন, “আমার পণ্য সব নিয়ম মেনে চলে,” আর সেটার প্রমাণ হিসেবে টেকনিক্যাল ফাইল আর ডিক্লারেশন অব কনফরমিটি বানান। এই ভুল বোঝাবুঝির কারণেই বাজারে অনেক ভুয়া CE লোগো দেখতে পাওয়া যায়, যেগুলো আসলে কোনো বৈধ যাচাই ছাড়াই বসিয়ে দেওয়া।
সব পণ্যে CE লাগে না, এটা প্রথমেই পরিষ্কার হয়ে নেওয়া ভালো। নিচের টেবিলে কিছু সাধারণ পণ্য দেখুন।
| পণ্যের ধরন | CE Marking লাগবে কি না |
| খেলনা | হ্যাঁ |
| মেডিকেল ডিভাইস | হ্যাঁ |
| মেশিনারি | হ্যাঁ |
| ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি | হ্যাঁ |
| ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE) | হ্যাঁ |
| নির্মাণ সামগ্রী | হ্যাঁ |
| গ্যাস অ্যাপ্লায়েন্স | হ্যাঁ |
| প্রসাধনী | সাধারণত না |
| আসবাবপত্র | নির্ভর করে ব্যবহারের ওপর |
নিয়মটা মনে রাখুন, যে পণ্য কোনো EU নিয়মের তালিকায় নেই, তার জন্য CE লাগবে না। নিজে নিশ্চিত না হলে একজন কমপ্লায়েন্স পরামর্শদাতার সাথে একবার কথা বলে নিন, সময় বাঁচবে।
খাবার, বেশিরভাগ প্রসাধনী, হাতে বানানো কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস মোটামুটি CE এর বাইরেই থাকে। কিন্তু সাবধান। খাবারের ক্ষেত্রে EU খাদ্য নিরাপত্তা আইন আলাদাভাবে আছে। CE না লাগলেই একদম নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকা যাবে না।
পুরো ব্যাপারটাকে মোটামুটি এভাবে সাজিয়ে বলা যায়।
১. আপনার পণ্য কোন EU নিয়মের আওতায় পড়ে সেটা প্রথমে বের করুন।
২. প্রযোজ্য স্ট্যান্ডার্ড খুঁজে নিন।
৩. পণ্যের ঝুঁকি যাচাই করুন।
৪. দরকারি ল্যাব টেস্ট করিয়ে নিন।
৫. টেকনিক্যাল ফাইল বানান।
৬. লাগলে নোটিফায়েড বডি দিয়ে মূল্যায়ন করান।
৭. ডিক্লারেশন অব কনফরমিটি লিখুন।
৮. পণ্যে CE লোগো বসান।
৯. ইউরোপে পাঠানোর জন্য সব রেডি করুন।
কোন ধাপে কতটা সময় লাগবে সেটা পণ্যের ঝুঁকি কতটা তার ওপর নির্ভর করে। কম ঝুঁকির পণ্যে স্ব ঘোষণাতেই কাজ শেষ, বেশি ঝুঁকির পণ্যে নোটিফায়েড বডি টানতেই হবে।
মোটামুটি এই কাগজগুলো লাগবেই।
তালিকাটা পণ্যভেদে একটু কমবেশি হতে পারে, তাই আপনার পণ্যের জন্য আলাদা করে চেকলিস্ট বানিয়ে নেওয়াই ভালো।
এটা একটা লেখা কাগজ, যেখানে প্রস্তুতকারক নিজে ঘোষণা দেন যে তার পণ্য EU এর সব শর্ত মানে। এখানে পণ্যের বিবরণ, কোন নিয়ম মানা হয়েছে, কোন স্ট্যান্ডার্ড ব্যবহার হয়েছে আর প্রস্তুতকারকের সই থাকে। কাস্টমস বা মার্কেট সার্ভিলেন্স চাইলে যে কোনো সময় এই কাগজ দেখতে চাইতে পারে।
টেকনিক্যাল ফাইল বলতে বোঝায় একগাদা কাগজপত্র, যা দিয়ে বোঝানো হয় পণ্যটা কীভাবে ডিজাইন হয়েছে, কীভাবে টেস্ট হয়েছে আর কীভাবে যাচাই হয়েছে। সাধারণত এতে ডিজাইন ড্রয়িং, ঝুঁকি যাচাই, টেস্ট রিপোর্ট আর ব্যবহারকারীর নির্দেশিকা থাকে। মার্কেট সার্ভিলেন্স চাইলে এই ফাইল দশ বছর পর্যন্ত জমা রাখতে হয়, তাই ফেলে দেওয়ার সুযোগ নেই।
নোটিফায়েড বডি হলো ইউরোপীয় কমিশনের অনুমোদিত একটা স্বাধীন সংস্থা, যারা বেশি ঝুঁকির পণ্যের যাচাই করে। সব পণ্যের জন্য এদের লাগে না, শুধু সেই পণ্যগুলোতে লাগে যেখানে আইন নিজেই তৃতীয় পক্ষের যাচাই বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে, যেমন কিছু মেডিকেল ডিভাইস বা প্রেশার ইকুইপমেন্ট।
বেশিরভাগ কম ঝুঁকির পণ্যে প্রস্তুতকারক নিজেই যাচাই করে ডিক্লারেশন দিতে পারেন, নোটিফায়েড বডির দরকার পড়ে না। যেমন সাধারণ ইলেকট্রনিক পণ্য বা লো ভোল্টেজ ডিভাইস। তবে খেয়াল রাখবেন, স্ব ঘোষণা মানে দায়িত্ব কমে যাওয়া না, বরং পুরো দায়িত্বটাই প্রস্তুতকারকের কাঁধে থেকে যায়।
সত্যি কথা বলতে, একটা ফিক্সড অংক বলে দেওয়া সম্ভব না, কারণ খরচ অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে।
একটা সাধারণ ইলেকট্রনিক পণ্যের খরচ আর একটা মেডিকেল ডিভাইসের খরচ একদম আলাদা মাত্রার হয়ে যায়। কেউ যদি আগেই একটা ফিক্সড টাকার অংক বলে দেয়, একটু সাবধান থাকবেন। আসল খরচ জানতে হলে আপনার পণ্যের স্পেসিফিকেশন নিয়ে সরাসরি একজন পরামর্শদাতার সাথে কথা বলাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
এটাও পণ্যভেদে বদলে যায়। কম ঝুঁকির পণ্যে টেস্টিং আর কাগজপত্র মিলিয়ে কয়েক সপ্তাহেই কাজ হয়ে যেতে পারে। নোটিফায়েড বডির যাচাই লাগলে কয়েক মাসও লেগে যেতে পারে, কারণ ল্যাব টেস্ট আর অডিট নিজেই সময় নেয়। রপ্তানির প্ল্যান করার সময় এই সময়টা আগেভাগে হিসাবে রাখা দরকার, নইলে শেষ মুহূর্তে ঝামেলায় পড়বেন।
সাধারণভাবে CE Marking এর কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ থাকে না, যতক্ষণ পণ্যের ডিজাইন আর নিয়মকানুন একই থাকে। কিন্তু পণ্যের ডিজাইন বদলালে, বা নিয়ম আপডেট হলে, আবার নতুন করে যাচাই করাতে হবে। তাই একবার CE পেয়ে গেলেই সারাজীবনের জন্য নিশ্চিন্ত, এমন ভাবার সুযোগ নেই, নিয়মের পরিবর্তন খেয়াল রাখতেই হবে।
এই দুইটা গুলিয়ে ফেলা মানুষ অনেক দেখেছি।
| CE Marking | ISO Certification |
| নির্দিষ্ট পণ্যের কমপ্লায়েন্স দেখায় | পুরো প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম দেখায় |
| যেখানে প্রযোজ্য সেখানে বাধ্যতামূলক | সাধারণত ইচ্ছাধীন |
| শুধু ইউরোপীয় বাজারের জন্য প্রাসঙ্গিক | দুনিয়াজুড়ে স্বীকৃত |
| স্ব ঘোষণা বা নোটিফায়েড বডি দিয়ে যাচাই হয় | সার্টিফিকেশন বডি অডিট করে |
বাংলাদেশ থেকে সরাসরি CE Marking দেওয়ার মতো কোনো সরকারি সংস্থা নেই, কারণ এটা পুরোপুরি EU এর নিজস্ব সিস্টেম। তবে বাংলাদেশি প্রস্তুতকারকরা কয়েকভাবে এগোতে পারেন।
প্রথমে দেখতে হবে আপনার পণ্য কোন নিয়মের আওতায় পড়ে। এরপর দরকারি টেস্টিং একটা স্বীকৃত ল্যাবে করাতে হবে, সেটা দেশেও হতে পারে, বিদেশেও হতে পারে। টেকনিক্যাল ফাইল বানানো, ডিক্লারেশন অব কনফরমিটি লেখা, আর দরকার হলে নোটিফায়েড বডির সাথে যোগাযোগ করাও এই কাজের অংশ।
এই জায়গাতেই HMS Universal এর মতো একটা অভিজ্ঞ পরামর্শদাতা কাজে লাগে। গ্যাপ অ্যাসেসমেন্ট থেকে শুরু করে ল্যাবের সাথে কথা বলা, কাগজপত্র বানানো, আর কোন নিয়ম কীভাবে প্রযোজ্য সেটা বুঝিয়ে দেওয়া, সবকিছুতেই একজন পরামর্শদাতা থাকলে সময় আর ভুল দুটোই কমে যায়।
বিশেষ করে যারা প্রথমবার ইউরোপে পাঠাচ্ছেন, তাদের জন্য এটা বেশ কাজে দেয়, কারণ একবার ভুল কাগজপত্রে শিপমেন্ট আটকে গেলে সময় আর টাকা দুটোই বেড়ে যায়।
যেসব পণ্য EU নিয়মের আওতায় পড়ে, তাদের জন্য বাধ্যতামূলক। যেসব পণ্য এই তালিকার বাইরে, তাদের জন্য দরকার নেই।
না, একেবারেই না। CE নির্দিষ্ট পণ্যের কমপ্লায়েন্স নিয়ে কাজ করে, আর ISO পুরো প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম নিয়ে কাজ করে।
বেশিরভাগ সময় প্রস্তুতকারক নিজেই স্ব ঘোষণা দিয়ে CE লাগাতে পারেন। কিছু বেশি ঝুঁকির পণ্যে নোটিফায়েড বডির যাচাই লাগে।
হ্যাঁ যায়, তবে সরাসরি কোনো বাংলাদেশি সরকারি সংস্থা এটা দেয় না। টেস্টিং, কাগজপত্র, আর দরকার হলে নোটিফায়েড বডির মাধ্যমে এই কাজ করতে হয়।
যেসব পণ্যে CE বাধ্যতামূলক, সেগুলো CE ছাড়া পাঠালে কাস্টমসে আটকে যেতে পারে বা জরিমানার মুখে পড়তে পারেন।
হ্যাঁ, প্রতিটা EU দেশের নিজস্ব মার্কেট সার্ভিলেন্স কর্তৃপক্ষ আছে, যারা নিয়ম না মানা পণ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।
CE Marking নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাটা হলো, এটাকে শুধু একটা কাগজ বা লোগো ভেবে বসা। আসলে এটা একটা পুরো প্রক্রিয়া, যেখানে পণ্যের নিরাপত্তা প্রমাণ করার দায়িত্ব প্রস্তুতকারকের নিজের কাঁধেই থাকে। যারা শুরুতেই কাজটা ঠিকভাবে করেন, তারা পরে শিপমেন্ট আটকে যাওয়া বা বায়ারের বিশ্বাস হারানোর মতো ঝামেলায় কম পড়েন।
আপনার পণ্য CE Marking এর আওতায় পড়ে কিনা, বা কোথা থেকে শুরু করবেন বুঝতে না পারলে, একবার HMS Universal এর সাথে কথা বলে দেখতে পারেন। গ্যাপ অ্যাসেসমেন্ট, কাগজপত্র বানানো, আর কোন EU নিয়ম কীভাবে প্রযোজ্য, সবকিছু নিয়ে সরাসরি পরামর্শ পাবেন।