Hermitage of Management & Standards Limited

ISO Consultancy Company In BD

HACCP কী এবং কেন বাংলাদেশের খাদ্য শিল্পে জরুরি?

HACCP কী এবং কেন বাংলাদেশের খাদ্য শিল্পে জরুরি?

ধরুন আপনার একটা খাবার তৈরির ব্যবসা আছে, বেকারি, মিষ্টির দোকান, বা মাছ প্যাকিং এর কারখানা যেটাই হোক। প্রতিদিনের কাজে আপনি নিজেও খেয়াল রাখেন, কর্মীরাও সাবধানে কাজ করে। কিন্তু সমস্যা হলো, কোনো একটা ভুল কোথায় হচ্ছে তা বোঝার আগেই অনেক সময় সেটা ছড়িয়ে যায়, একটা পুরো ব্যাচ খারাপ হয়ে যায়, বা কোনো ক্রেতা অভিযোগ নিয়ে আসে। তখন খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়ে, ঠিক কোন পর্যায়ে গিয়ে কাজটা ভুল হয়েছিল।

HACCP মূলত এই সমস্যার সমাধানের জন্যই তৈরি একটা পদ্ধতি। নাম শুনতে কঠিন লাগলেও কাজটা আসলে সহজ, খাবার তৈরির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটা ধাপে আগে থেকেই দেখে রাখা কোথায় কোথায় ভুল হওয়ার সম্ভাবনা আছে, এবং সেই জায়গাগুলোতে নিয়মিত নজর রাখা। যাতে সমস্যা বড় হওয়ার আগেই ধরা পড়ে যায়, ব্যাচ নষ্ট হওয়ার বা ক্রেতার অভিযোগ আসার আগেই।

HACCP আসলে কীভাবে কাজ করে

আগে খাবারের মান যাচাই হতো একদম শেষে, পণ্য তৈরি হয়ে যাওয়ার পর। সমস্যা হলো, তখন কিছু ভুল পাওয়া গেলে পুরো ব্যাচটাই ফেলে দিতে হতো। কাঁচামাল, সময়, টাকা সব নষ্ট।

HACCP এর চিন্তাটা একটু আলাদা। এখানে শুরু থেকেই দেখা হয়, কাঁচামাল কোথা থেকে আসছে, কীভাবে রাখা হচ্ছে, রান্না বা প্রসেসিং এর সময় তাপমাত্রা কেমন, প্যাকেজিং এর সময় কী হচ্ছে, পরিবহনের সময় কী অবস্থায় থাকছে। এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে যেসব জায়গায় ভুল হলে বড় বিপদ হতে পারে, সেগুলোকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনা হয়। এই জায়গাগুলোকেই বলা হয় Critical Control Point বা CCP।

এই পদ্ধতি প্রথম তৈরি হয়েছিল মহাকাশ অভিযানের খাবারের জন্য, যাতে নভোচারীদের কোনোভাবেই খাবারে সমস্যা না হয়। এখন এটাই সারা দুনিয়ার খাদ্য শিল্পে একটা সাধারণ ভাষা হয়ে গেছে। কোডেক্স অ্যালিমেন্টারিয়াস এই পদ্ধতিকে আন্তর্জাতিক মান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

HACCP এর সাতটা মূল ধাপ

পুরো সিস্টেমটা সাতটা ধাপে ভাগ করা থাকে। শুনতে কঠিন লাগলেও আসলে ব্যাপারটা একটা যুক্তিসঙ্গত প্রক্রিয়া মাত্র।

প্রথমে দেখতে হয় কোথায় কোথায় সমস্যা হতে পারে, জীবাণু, রাসায়নিক, বা কোনো শারীরিক উপাদান যা খাবারে চলে আসতে পারে। তারপর ঠিক করতে হয় কোন কোন জায়গা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে নজর না দিলে বিপদ হবেই। এরপর প্রতিটা জায়গার জন্য একটা সীমা ঠিক করা হয়, যেমন তাপমাত্রা ৭৫ ডিগ্রির নিচে নামা যাবে না। তারপর নিয়মিত চেক করার একটা পদ্ধতি বানাতে হয়, কে কখন কী চেক করবে। যদি কখনো সীমা পার হয়ে যায়, কী করতে হবে সেটাও আগে থেকেই ঠিক করে রাখা হয়। পাশাপাশি পুরো সিস্টেম মাঝে মাঝে যাচাই করে দেখতে হয় ঠিকমতো চলছে কিনা। আর সবশেষে, সব কিছুর লিখিত প্রমাণ রাখতে হয়, কারণ মুখে বললে হবে না, কাগজে থাকা লাগবে।

এই সাতটা ধাপ একসাথে মিলে একটা প্রতিষ্ঠানকে বুঝিয়ে দেয় কোথায় সমস্যা হতে পারে, আগে থেকে কী করতে হবে, এবং পরে দরকার হলে কীভাবে প্রমাণ দেখানো যাবে যে সব ঠিকঠাক ছিল।

বাংলাদেশের খাদ্য ব্যবসায় HACCP কেন জরুরি হয়ে উঠছে

রপ্তানি করতে চাইলে এটা ছাড়া এগোনো কঠিন

বাংলাদেশের চিংড়ি, মাছ এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার যারা ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যে পাঠান, তারা ভালো জানেন এই ব্যাপারটা। বিদেশি ক্রেতারা এখন মুখের কথায় বিশ্বাস করে না, কাগজপত্র চায়। HACCP সার্টিফিকেট না থাকলে অনেক সময় কন্টেইনার বন্দরেই আটকে যায়, বা অর্ডার বাতিল হয়ে যায়। একবার এই সিস্টেম গড়ে নিলে বিদেশি ক্রেতার সাথে দাম এবং শর্ত নিয়ে কথা বলাটাও অনেক সহজ হয়ে যায়।

দেশের ভেতরেও নিয়ম কড়া হচ্ছে দিন দিন

বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথরিটি এবং বিএসটিআই এর তদারকি আগের চেয়ে বেড়েছে। বড় সুপারশপ, হোটেল চেইন আর প্রতিষ্ঠিত ফুড কোম্পানিগুলো এখন তাদের সাপ্লায়ারদের কাছেও HACCP চায়। মানে আপনি নিজে রপ্তানি না করলেও, যদি আপনার ক্রেতা একটা বড় চেইন হয়, তারা এই সার্টিফিকেট দেখতে চাইবে। যারা আগেভাগে এটা করে রাখেন, পরে আর তাড়াহুড়ো করতে হয় না।

একটা খারাপ ঘটনা পুরো নাম ডুবিয়ে দিতে পারে

আমাদের দেশে খাদ্যবাহিত অসুস্থতার খবর হঠাৎ ভাইরাল হয়ে যায়, এবং একটা ব্র্যান্ডের জন্য সেটা সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় ব্যবসা বহু বছরের পুরনো হলেও একটা ভুলের কারণে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয়। HACCP থাকলে এই ধরনের সমস্যা শুরুতেই ধরা পড়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়, কারণ আগে থেকেই জানা থাকে কোথায় কোথায় নজর রাখতে হবে।

আসলে এটা খরচ বাঁচায়, খরচ বাড়ায় না

অনেকেই ভাবেন HACCP মানে বাড়তি খরচ আর কাগজের কাজ। কিন্তু যারা এটা ঠিকভাবে চালু করেছেন, তাদের অভিজ্ঞতা একটু আলাদা। কাঁচামাল নষ্ট হওয়া কমে যায়, কারণ ছোট সমস্যা বড় হওয়ার আগেই ধরা পড়ে। একটা পুরো ব্যাচ ফেলে দেওয়ার চেয়ে শুরুতেই একটা ছোট অংশ ঠিক করে নেওয়া অনেক সাশ্রয়ী।

ক্রেতার মনে বিশ্বাস তৈরি হয়

ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং অন্যান্য শহরের মানুষ এখন খাবারের প্যাকেটে কী লেখা আছে সেটা আগের চেয়ে বেশি খুঁটিয়ে দেখে। যখন একটা প্রতিষ্ঠান বলতে পারে তারা HACCP মান অনুসরণ করে, ক্রেতার মনে একটা ভরসা তৈরি হয়, যে এই প্রতিষ্ঠান শুধু বিক্রি করার জন্য খাবার বানাচ্ছে না, মানের ব্যাপারেও সচেতন।

কোন কোন ব্যবসার জন্য এটা লাগে

মাছ এবং সামুদ্রিক খাবার প্রসেসিং কারখানার জন্য এটা প্রায় বাধ্যতামূলক বলা যায়। বেকারি এবং মিষ্টির দোকান, যেখানে কাঁচামাল এবং প্যাকেজিং দুই জায়গায়ই ঝুঁকি থাকে। দুধ এবং দুগ্ধজাত পণ্যের প্রতিষ্ঠান, যেখানে তাপমাত্রা ঠিক রাখাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পানীয় এবং বোতলজাত পানি কোম্পানি। হোটেল ও রেস্টুরেন্ট চেইন, বিশেষ করে যাদের একটা কেন্দ্রীয় কিচেন থেকে অনেকগুলো আউটলেটে খাবার যায়। আর যারা খাদ্যপণ্য আমদানি রপ্তানির ব্যবসায় আছেন, তাদের ক্রেতা প্রায়ই জানতে চায় পুরো সাপ্লাই চেইনে কোথায় কী হচ্ছে।

সার্টিফিকেট পেতে হলে কী করতে হয়

প্রথমে একটা গ্যাপ অ্যানালাইসিস করা হয়, মানে এখন যেভাবে কাজ চলছে সেটা HACCP এর সাতটা ধাপের সাথে কতটা মিলে যায় তা দেখা। তারপর তৈরি করতে হয় প্রি রিকুইজিট প্রোগ্রাম, যার মধ্যে থাকে পরিচ্ছন্নতার নিয়ম, পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ, কর্মীদের স্বাস্থ্যবিধি, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ এসব। এরপর প্রতিটা প্রক্রিয়ার জন্য বিপদের জায়গাগুলো খুঁজে CCP ঠিক করা হয়, এবং সেগুলোর জন্য রেকর্ড রাখার সিস্টেম দাঁড় করানো হয়। সব ঠিকঠাক হলে একটা স্বীকৃত সার্টিফিকেশন প্রতিষ্ঠান এসে অডিট করে, এবং সবকিছু ঠিক থাকলে সার্টিফিকেট দিয়ে দেয়।

পুরো কাজটা একদিনে হয়ে যায় না, এটা মাথায় রাখা ভালো। প্রতিষ্ঠানের আকার এবং বর্তমানে কাজের অবস্থা কতটা গোছানো তার উপর নির্ভর করে এটা কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস লাগতে পারে। যারা এই বিষয়ে নিজে থেকে সিস্টেম দাঁড় করাতে গিয়ে আটকে যান, তাদের জন্য HACCP সার্টিফিকেশন সার্ভিস থেকে গ্যাপ অ্যানালাইসিস থেকে শুরু করে পুরো প্রক্রিয়ায় সহায়তা নেওয়া যায়, যাতে প্রথম থেকেই কাগজপত্র এবং সিস্টেম দুটোই সঠিকভাবে দাঁড় করানো যায়।

HACCP আর ISO 22000 এর মধ্যে পার্থক্য কী

এই দুটো নিয়ে অনেকে গুলিয়ে ফেলেন। সহজভাবে বললে, HACCP মূলত বিপদ চিহ্নিত করা আর সেগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখার একটা কাঠামো। আর ISO 22000 এর মধ্যে HACCP এর সব নিয়মই আছে, কিন্তু সাথে আরও যুক্ত হয় ম্যানেজমেন্ট রিভিউ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, এবং সময়ের সাথে সিস্টেম উন্নত করার একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। অনেক প্রতিষ্ঠান প্রথমে HACCP দিয়ে শুরু করে, এটাকে ভিত্তি ধরে পরে চাইলে ISO 22000 এর দিকে এগিয়ে যায়।

কিছু সাধারণ প্রশ্ন

HACCP সার্টিফিকেট কতদিন কাজ করে?

সাধারণত তিন বছর বৈধ থাকে, এর মধ্যে নিয়মিত সার্ভিল্যান্স অডিট হয়।

HACCP সার্টিফিকেট নিতে খরচ কত পড়ে?

ব্যবসার আকার এবং বর্তমান অবস্থা কতটা গোছানো তার উপর নির্ভর করে এটা ভিন্ন হয়। প্রথমে একটা গ্যাপ অ্যানালাইসিস করিয়ে নিলে কত খরচ লাগবে তার একটা পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।

ছোট ব্যবসার জন্যও কি এটা দরকার?

আকারে ছোট হলেও যদি পণ্য কোনো সুপারশপ, বড় হোটেল বা বিদেশি ক্রেতার কাছে যায়, তাহলে এটা থাকলে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা যায়।

সাধারণ মান নিয়ন্ত্রণ আর HACCP কি একই জিনিস?

না, একটু আলাদা। সাধারণ মান নিয়ন্ত্রণ পণ্যের গুণমান দেখে, আর HACCP মূলত নিরাপত্তা ঝুঁকি ঠেকানোর জন্য। দুটো একসাথে চললে সবচেয়ে ভালো হয়।

শেষ কথা

বাংলাদেশের খাদ্য শিল্প যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, রপ্তানি বাড়ছে, বড় চেইন তৈরি হচ্ছে, ক্রেতারাও আগের চেয়ে বেশি জানতে চাইছে কী খাচ্ছেন তারা, এই পরিস্থিতিতে HACCP একটা ঐচ্ছিক বিষয় না, বরং দিন দিন একটা বাস্তব দরকার হয়ে উঠছে। যারা আগেভাগে এই কাঠামো গড়ে নেন, তারা শুধু একটা সার্টিফিকেট পান না, একটা স্থিতিশীল এবং নিরাপদ উৎপাদন প্রক্রিয়াও পেয়ে যান, যা দীর্ঘ সময় ধরে ক্রেতা এবং বাজার দুটোই ধরে রাখতে সাহায্য করে।